রামিম সন্ধ্যা থেকে থেমে থেমে ডাকছে , আম্মা ! ও মা !
উথাল পাথাল গায়ে জ্বর নিয়ে গত দুই দিন ধরে বেশ কষ্ট পাচ্ছে রামিম । রামিমের মা সুলতানা ছেলের জন্য সুপ বানাচ্ছেন । ওখান থেকে তিনিও মাঝে মাঝে ডাক দিচ্ছেন , '' আসছিরে বাপ , একটু সবুর কর । স্যুপটা খেলে গায়ে একটু বল পাবি । "
রামিম , মনে মনে বলল " স্যুপ খাব না । এরচেয়ে বরং এক বাটি ছাগলের মু... দাও ! ''
সুলতানা কিচেনে নিজে নিজেই গজ গজ করতে থাকেন , '' কোন কিছুর ঠিক ঠিকানা নেই তোর । কই থাকিস ! কি সব যে খাস কে জানে ! প্রতিদিন দুপুরে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে আমি আর পারছি না । প্রতিদিন নতুন নতুন বাহানা , আজ এক্সট্রা ক্লাস ছিল , না হয় প্রেক্টিকেল ক্লাস ছিল , আজ এখানে দেরী - সেখানে দেরী । কে জানে এসবের কতটুকু সত্যি । ''
'' বাপ , মিথ্যে বলিস না । মা-বাবার সাথে মিথ্যে বলা ঠিক না । ''
'' এসব কথা আসছে কেনো এখন ? মা , আমি এখন স্যুপ খাবো না । ''
'' আচ্ছা বাবা, এখন খেতে হবে না । তোর পাশেই থাক । যখন ইচ্ছে হবে খেয়ে নিস । আমি গিয়ে দেখি তোর দাদি কই । মুরব্বি মানুষ ; দোয়া পড়ে ফুঁ দিলে সেরে উঠবি । ''
বলেই সুলতানা বড় ঘরের দিকে পা বাড়ান ।
রামিম শুয়ে শুয়ে ঘরের দক্ষিনের জানালা দিয়ে আকাশ দেখছে । সন্ধ্যার আকাশে একধরনের রহস্য খেলা করে । রামিম সেটা ধরার চেষ্টা করছে । কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না । তবে হঠাত্ তার বুকের ভেতর কিঞ্চিত ভাললাগা ঘুরে উঠে । চোখের মাঝে উচ্চারিত হয় জয়ন্তীর হাসি হাসি মুখ । জ্বরের কারনে তার সাথে রামিমের দেখা হয়নি গত দুই দিন । জয়ন্তী নিশ্চই চিন্তিত । ইচ্ছে করলেই সে কিন্তু সামান্তাকে নিয়ে দেখে যেতে পারে তাকে । কিংবা একটা ফোন করতে পারে । এটা নিয়ে কিছুটা অভিমান অবশ্য রামিম করতেই পারে । তবে সেখানেও একটু সমস্যা আছে । জয়ন্তীর মোবাইল নেই ।
হঠাত্ সিমেন্স সি ৩৫ মোবাইল ফোনের কুঁ কুঁ আওয়াজে রামিমের চিন্তায় বাধা পড়ে । ফোন করেছে সামান্তা ।
-- ঐ রামিম , শুনলাম তোর নাকি '' তোর কপালে আমার পা '' টাইপ অবস্থা ?
( অনেক কষ্টে রামিম হাসি চাপিয়ে রাখে । এই মেয়ের মুখে ভাল কথা আসা করা ও অলীক বস্তু )
: এটা আবার কি জিনিস ?
-- কোনটা ?
: এই যে '' আমার কপালে তোর পা '' । এর মানে কি ?
-- এর মানে হল খুবই কাহিল অবস্থা । কি হইছে তোর ? ক্যান্সার ফ্যান্সার নাতো আবার !
: তোর মুখে 'সু' ডাক শুনলাম না কখনো । জ্বরের যন্ত্রণায় বাঁচি না , আর তুই ফাইজলামির দোকান খুলে বসলি ।
-- আচ্ছা বাদ দে । আজকে জয়ন্তীর বাসায় গিয়েছিলাম । সে বেচারি বাসায় আটকে আছে । কলেজ বন্ধ ; বাসা থেকে বের হবার কোন কারন নেই । আগামিকাল আসফাক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে আসার পথে আসতে পারি সবাই । কাল পর্যন্ত জ্বরটা ধরে রাখ । তাহলে জয়ন্তীর সেবা পেলেও পেতে পারিস ।
: সত্যি সত্যি আসবি নাকি তোরা ! আমার তো মনে হয় জ্বর আরেক ডিগ্রি বেড়ে গেল ।(গ্যাপ দিয়ে তুমি আসলে আমার ও একই অনভুতি হয় ঃপ)
-- আচ্ছা তুই জ্বর বাড়াতে থাক । মা ডাকছে , আমি গেলাম ।
রামিম মোবাইলের নীলাভ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেক্ষণ ।
সুলতানা চিকন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার ছেলের দিকে । তার ভাবতেই অবাক লাগছে , তার ছেলে এত বড় হয়ে গেছে । যে ছেলেকে তিনি নিজের মাঝে আড়াল করে এত বড় করেছেন , কোন মেয়ের ছায়া মাড়াতে দেন নি কোন দিন , আজ তার সামনেই রামিম বসে আছে ৪-৫ জন বান্ধবীর মধ্যে । নিজের চোখ কে বিশ্বাস করে পারছেন না তিনি । বার বার ঝাপসা হয়ে আসছে তার দৃষ্টি । জয়ন্তী , রামিমের কপালে হাত রাখতেই সুলতানার ভেতরটা কেমন জানি মোছড় দিয়ে উঠে । তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন , সবাই চলে যাবার পর আজকে তিনি রামিম কে কিছু কঠিন কথা বলবেন । বড় অনিচ্ছায় তিনি কিচেনের দিকে গেলেন ।
'' মাসে দুই তিন বার জ্বর হওয়া ভাল কথা না । ডাক্তার দিখিয়েছ ? '' জয়ন্তীর অভিমানী কন্ঠ ।
'' হুমম । চিন্তা করো না । সেরে যাবে । তুমি যাবার সময় মনে করে টেবিলের উপর রাখা খাতাটা নিয়ে যেও । ''
'' আর তোমার প্রেক্টিকেল খাতা ! কিছুই তো লিখনি । আমাকে দিয়ে দাও । আমি লিখে দিব । ''
'' না না , আমি লিখে নিব ; সমস্যা নেই । ''
ওদের কথার মাঝখানে সামান্তা ঢুকে পড়ে । '' আপনাদের প্রেমালাপ শেষ হলে আমরা এখন উঠি ! ''
এককথায় সবাই উঠে দাঁড়ায় । সামান্তা রামিমের আম্মুর খোঁজে ভেতরে চলে গেল । জয়ন্তী খাতা নিতে গিয়ে রামিমের টেবিল গুছাতে শুরু করে । এই ফাঁকে সে রামিমের প্রক্টিকেল খাতা খুলে দেখে আসলে কিছুই করে নি সে । খাতাগুলোও নিজের ব্যাগে নিয়ে নিল জয়ন্তী । সুলতানা সবাই কে বাড়ির দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসেন ।
বাড়ি ফিরে রামিমের খাতা খু্লতেই জয়ন্তীর মনটা তীব্র ভাললাগায় ভরে গেল । মুক্তার মতো হাতের লেখা, রামিমের লেখা আরো একটা কবিতা । কবিতটা হাতে নিয়ে জয়ন্তীর ভেতর থেকে একটা করুণ দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে ; '' এই ছেলে কি কখনো জানবে সে তাকে কতটা ভালবাসে ! '' । জয়ন্তীর মনে পরে , রামিম একবার বলেছিল - '' সব মানুষের ভেতর একটা সাপ বসবাস করে । তাই আমরা মাঝে মাঝেই ফুঁসফাঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি । আমি সাপ ভয় পাই । সুতরাং আমার সাথে যতক্ষণ থাকবে কোন ধরনের ফুঁসফাঁস চলবে না '' । জয়ন্তীর হাসি পায় । এমন ফিলোসফি রামিমের মাথায় প্রায়ই আসে । আহা ! তার কথাগুলো তার কবিতার মতই সুন্দর । কবিতাটা পড়তে থাকে জয়ন্তী ............
আলাপ :
_ কি ওটা তোমার হাতে ?
: এটা ? এটা একটা শাড়ি ।
_ ওটা তো নীলাম্বর ।
: তোমার আদুড় গায়ে জড়ালেই মনে হবে নীল কাতান । আর তুমি হবে '' সোনাবউ'' (আমারই সোনাবউ।।আমাকেতো কোন নামই দাও নাই :() ।
_ কিন্তু আমি যে সাধারন কোন নারী ।
: একটু অপেক্ষা করো তবে । এবার দেখো ।
_ কি ওটা ? ওটা তো চাঁদ ।
: তোমার ভ্রু-যুগলের মধ্যে বসিয়ে দেখতে চাই , কে উর্বশী ? তুমি , না এই শারদ শশী ।
_ কিন্তু আমি যে চাঁদের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে ঘুরতে চাই না । আমি চাই, তুমি হাত রাখ আমার কপালে / বুড়ি চাঁদ, ভেসে যাক সুখের বেনোজলে ।
: এবার একটু খেয়াল করে দেখো ; দেখতে পাচ্ছ ?
_ কি ওটা ?
: এটা একটা দ্বীপ ।
_ কি আছে ওখানে ?
: ওখানেই আমার নিবাস । ইট কাটের দালান । তুমি খানিক '' ভ '' ছড়ালেই হয়ে উঠবে ঘর । বিশ্ব চরাচরে আমাদের দ্বীপ হবে একমাত্র বাতিঘর ।
_ আর আমরা হবো তার আলোকবর্তিকা । (হবে তো আমার আলোকবর্তিকা?)
_________________________________________________
রামিম তার রুমের দরজায় বড় করে লিখে রেখেছে ...
" কেয়ামত ঘনিয়ে আসছে । প্রস্থুতি চলছে । প্লিজ বিরক্ত করবেন না । "
সুলতানা নিজের ছেলের কর্মকান্ডে বেশ মজা পেলেন । একবার ভাবলেন ছেলেকে ডাকবেন না । পরে আবার কি চিন্তা করে ডাকলেন '' রামিম , বাবা দরজাটা একটু খোল । "
রামিম দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে । হাসি হাসি মুখ । '' কিছু বলবে মা ? "
'' না , তেমন কিছু না । শরীর কেমন এখন ? কিছু খাবি ? "
'' মা , আমার শরীর ভাল । আর এখন কিছু খাবো না । সামনে পরীক্ষা , অনেক পড়া । তুমি কি আর কিছু বলবে ? ।"
সুলতানা খেয়াল করলেন , রামিম দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে । " সে কি চায় না আমি ভেতরে যাই , একটু বসি । ছেলেটা খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে " সুলতানা মনে মনে ভাবছেন ।
" আমি একটু বসি তোর পাশে । তুই পড়তে থাক । "
রামিম সরে গিয়ে টেবিলে গিয়ে বসল । " মা , তুমি কিছু বলতে চাও ; বলে ফেল । "
" আচ্ছা ঐ দিন যে মেয়েগুলো আসলো । মানে , তোর সাথে যে পড়ে । ওরা কি সবাই তোর বান্ধবী ? " সুলতানা ছেলের দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছেন ।
" হ্যাঁ মা , ওরা সবাই আমার বান্ধবী । কেন ? "
" আচ্ছা , ওদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে , যে বান্ধবীর থেকে একটু বেশী কেউ ? "
রামিম সুলতানার দিকে তাকালো । একটু ভয় ভয় লাগছে তার । তার মা কিছু বুঝে ফেললো না তো !
" না মা , তেমন কেউ নেই । হলে তোমাকে জানাবো " রামিম হাসতে থাকে ।
সুলতানা আর কিছু বললেন না । তিনি তার নিজের ছেলেকে দেখছেন । এই তো সেদিন কার কথা । সামান্য শামুক দেখে ভয় পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বসে ছিল অনেক্ষণ । আজ কত বড় হয়ে গেছে । কোঁকড়ানো চুল , বাঁশির মত নাক , মেয়েদের মত টানা টানা চোখ । যে কোন মেয়েই তো তার ছেলের প্রেমে পড়বে । কিন্তু রামিম অন্য যে কোন ছেলের মত না , সেটা তার জানা দরকার । তাকে এখন সব না বললে দেরী হয়ে যাবে হয়ত । কিন্তু কিভাবে বলবেন তা-ই মনে মনে গুছিয়ে নিলেন সুলতানা ।
'' আচ্ছা রামিম , বাবা তোর কেমন মেয়ে পছন্দ ? ।"
" তোমার এমন ফালতু কথা বন্ধ হলে আমি এখন একটু পড়া লেখা করতে চাই আম্মা । " রামিম কিছুটা বিরক্ত হয় ।
" ফালতু কথা না বাবা । শোন , তুই বড় হলেই তোর জন্য স্নিগ্ধ একটা মেয়েকে বউ করে আনবো । কিন্তু এখন কোন মেয়ের আশেপাশে যাসনে বাবা । কোন মেয়েকেও তোর কাছাকাছি আসতে দিবি না । তুই হলি শুদ্ধ ছেলে । মেয়েদের ছায়া , যে কোন মেয়েদের সঙ্গ তোর জন্য খারাপ হবে । এই যে তোর ঘন ঘন জ্বর হয় , আমার মনে হয় এসব করনে । তুই যখন ছোট ছিলি তোর এরকম জ্বর হতো । পাড়ার অনেক মেয়েরাই তোকে কোলে নিতে চাইতো । আমি কত ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়েছি । শেষে এক হুজুর আমাকে বলেছিলেন , তুই বড় না হওয়া পর্যন্ত তোকে যেন মেয়েদের থেকে দূরে রাখি । মেয়েদের অনেক ধরনের অসুখ হয় । এই সময় তুই মেয়েদের কাছে গেলে তোর জন্য খুব খারাপ হবে । বাপরে ! আমি তোর মা , মা-বাবার কথা শুনতে হয় । তুই বড় হলে, যে মেয়েকে তুই বলবি তার সাথেই তোকে বিয়ে দেব । "
" আমি আর কত বড় হবো মা ! আমার মাথা এই বাড়ির ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তবে ? " রামিম হাসে ।
" আমি জানি না । তবে আমি তোর মা , আমার কথা তুই না শুনলে তোর জন্য খারাপ হবে । " বলেই সুলতানা হন হন করে রুম থেকে বের হয়ে যান ।
রামিম তাকিয়ে থাকে সুলতানার চলে যাওয়ার দিকে । তার সহজ সরল মায়ের সহজ কথা গুলো তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে । সে নিজেই বুঝতে পারে না এই সাধারন কথা গুলো তার জীবনে কি রহস্যই না নিয়ে আসেবে ।
____________________________________________________
আজ জয়ন্তীর "না" দিবস । সকালে তার ছোট বোন এসে বললো " দিদি আম্মু ডাকে তোমাকে । এখন আসো "
জয়ন্তী চোখ না মেলেই বলল " না " । সে-ই থেকে " না " দিনের অশুভ সূচনা । আজকের সব কিছু না-র উপর দিয়ে যাবে । আজ সে কোথাও যাবে না । এমন কি রুম থেকেও বের হবে না । সামনে এইচ,এস,সি পরীক্ষা । জয়ন্তী এইটা নিয়ে খানিকটা চিন্তিত । "না " দিবসের কারনে সারাদিন পড়ালেখা না হওয়ার একটা বড় সম্ভাবনা আছে । কারন একটু পরেই তার আম্মু এসে বলবে , পড়তে বসতে । কিন্তু না দিবসের কারনে তার পড়া হবে না ।
বিকেলে জয়ন্তীর মা এসে বললেন , তারাতারি রেড়ি হয়ে নিতে , মার্কেটে যাবেন । জয়ন্তী জানিয়ে দিয়েছে সে এখন কোথাও যাবে না । এর একটু পরেই জয়ন্তী নিজেই আফসোস করতে থাকলো । এমন দিনে তার মা কেন বলতে এলো মার্কেটে যাবার কথা !
সিডি প্লেয়ারে বড় করে গান ছেড়ে দেয় জয়ন্তী ...
চমকিবে ফাগুনেরও পবণে
বসিবে আকাশবানে শ্রবণে
চিত্ত আকুল হবে অনুক্ষন- অকারণ
‘দূর হতে আমি তারে সাধিব
গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব’
বাঁধনবিহীন সে যে বাঁধন- অকারণ
মায়াবন বিহারীনি
হরিনী গহন স্বপন সঞ্চারীনি (গান টা আমার ও অনেক পছন্দের)
এমন সময় জয়ন্তীর ছোট বোন এসে বলে , " দিদি নিচে আসো "
" না "
" রামিম ভাই আসছে । না আসলে থাকো "
জয়ন্তী চেতনায় ফিরে আসে । " সুপ্রি , দিদিমনি ; আম্মু- আব্বু কই ? "
" একটু আগে বের হয়ে গেছে । "
" গ্রেট । রামিম কে আমার রুমে নিয়ে আসো না , দিদি মনি । প্লি...জ । "
রামিম বসে আছে জয়ন্তীর রুমে । গুছানো রুম । জয়ন্তী সামনের দোকানে গেছে কোক আনতে । জয়ন্তীর ডায়েরীটা পড়ার টেবিলের উপরেই ছিল । আশেপাশে তাকিয়ে একের পর এক পাতা উল্টাতে থাকে রামিম । হঠাত্ একটা পাতায় চোখ আটকে যায় রামিমের । তাকেই সম্বোধন করে লেখা । পড়তে থাকে সে ............
রামিম , আমি জানি আমি যা -ই লিখি না কেন খুব বাড়িয়ে চড়িয়ে দেখলে ও তাকে তোমার সামান্য একটা কবিতার সামনে দাঁড় করানো যাবে না । আমি ধাঁধায় পড়ে যাই , কোনটা বেশী বড় আমার কাছে , তোমার অজস্র লেখায় জেগে উঠা পাঁজরের প্রবিষ্ট প্রেম , নাকি আমার দিকে তাকিয়ে , চোখে চোখ রেখে তোমার বলে যাওয়া ভালবাসার উপাখ্যান ? আমি তো আমার মতই অসম্প্রর্কিত জ্ঞানে এতদিন উপস্থাপন করেছি আমাকে । তুমি কি বুঝতে পারো , তোমার প্রতিটা কথার কদর্থ কারার ভেতরে লুকানো অর্থ । যদি বুঝতে তবে তুমিও একদিন জেনে যেতে মেয়েদের জীবনের প্রথম পাঠ লুকোচুরি ।
যেদিন আমি তোমার হয়ে যাব , কিংবা দুজন দুজনার ; সেদিন কিভাবে লুকাবো আমার ভেতরের চঞ্চলতা ?(প্রশ্নটা তোমাকে ও করলাম কোথাই লুকাবে?)
নীচে জয়ন্তীর আওয়াজ শুনতে পায় রামিম । ডায়রী রেখে প্রেক্টিকেল খাতায় চোখ বুলাতে থাকে সে । তার বুকের ভিতর একটা অচিন পাখি ডাকতে থাকে অবিরাম । কোন ভাবেই থামাতে পারেনা সে সেই ডাক । সেদিন যখন শিশু একাডেমীতে জয়ন্তী এসেছিল , তখন ও রামিম জানতো না জয়ন্তী তাকে ভালবাসে । সেদিন জয়ন্তী যা বলেছিল সেটা নামহীন কোন সম্পর্কের কথা । ঠিক বন্ধুত্ব ও নয় তার চেয়ে বেশী কিছু । তবে সেটা ভালবাসা ও তো ছিল না । গত একবছরে তাদের যে সম্পর্ক , খুব অনর্থ করলেও তাকে কোনভাবে প্রেম বলা যাবে না । জয়ন্তী হয়ত চায়নি ধর্মের মত একটা নিশ্চিত বাঁধা তাদের দুজনের সম্পর্ককে আরো অনিশ্চিত করে দিক ।
" জ্বর কুমারের কি খবর " জয়ন্তী হাসতে হাসতে রুমে ঢুকে ,
'' ভাল । বেশ কয়দিন ধরে প্রেক্টিকেল খাতা গুলো খুঁজছিলাম । সেদিন বলোনি তো তুমি নিয়ে আসবে ! "
" ভাবলাম তোমার শরীর খারাপ । আমিই লিখে দেই । ...কোক নাও । আর কিছু খাবে ? "
"না "
" এমনি জিজ্ঞেস করলাম । মা বাসায় নেই । আর আমি রান্না পারি না । সো ... "
" বললাম তো , আমি ঠিক আছি । "
" তোমাকে অনেক দিন দেখি না । আমি যখন তখন বের হতে পারি না । তুমি তো আসতে পারতে ! কি এমন ব্যস্ততা তোমার ? "
কোন কথা বলে না রামিম । বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকে ।
" এক কাজ কর বইটা বাসায় নিয়ে যাও । রামিমচন্দ্র বিদ্যাসাগর । যেখানে যাও , সেখানে পড়া শুরু ! "
রামিম হাসে ।
" আচ্ছা জয়া , আমাদের দুজনের যে সম্পর্ক তার নাম কি ? " রামিম পূর্ণদৃষ্টিতে জয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে থাকে ।
জয়ন্তীকে কিছুটা অন্যমনস্ক মনে হয় ।
" হঠাত্ এই প্রশ্ন ? "
" এমনি । বলো না "
" কি জানি ! তুমিই একটা নাম দাও না । " ..................হেয়ালী করে জয়ন্তী । হঠাত্ তার চোখ পড়ে টেবিলের উপর রাখা ডায়রীর উপর । সে বুঝে উঠতে পারে না , কি করবে ?
" তুমি পড়ছো ওটা !!!!!!!!! " চিত্কার দিয়ে উঠে জয়ন্তী ।
" হুমম " ।
পলকহীন তাকিয়ে আছে রামিম জয়ন্তীর দিকে । থর থর করে কেঁপে উঠে জয়ন্তীর ভেতরটা । রাশি রাশি অব্যক্ত কথা খসে পড়তে থাকে । শরীরের সমস্ত পানি ফুলে ফেঁপে জমতে শুরু করে তার চোখের কোনে ।
রামিম ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় জয়ন্তীর দিকে । তার মনে হয় কে জানি তার পায়ে মোটা লোহার শেঁকলে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে । আচানক থমকে গেছে সব কিছু । পৃথিবীর সবচে রূপসী রাজকন্যাদের একজন তার সামনে বসে কাঁদছে । এমন বিরল মুহুর্তে সে জানে না তার কি করা উচিত । রামিম হাঁটু গেড়ে বসে জয়ন্তীর সামনে ।
এরপর যা হলো সেটা কোথাও কোন এক অদৃশ্যলোকে বসে কেউ একজন হয়ত ভেবে রেখেছিলেন । কিন্তু মিলনে বিশ্বাসে এই দুজন নর নারীর কেউই এর আগে ভাবেনি । কারন এর আগে দুজনের এতো কাছাকাছি দুজন কখনো আসেনি । যেখানে দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে । শুষ্ক-রুক্ষ্ণ পৃথিবী শুষে নিচ্ছে শরীরের শেষ জলকনা । যেন দুজনের অধরে এতো পিপাসা আগে ছিলো না । দূরে দূরে থেকে চুপসে যাওয়া জয়ন্তীর ঠোঁটের তিলটা এতদিন পর যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে । উথলি যখন উঠেছে তাদের মনের বাসনা জগতে তখন কিসের ডর !
____________________________________________________
সেই চিরায়ত রহস্যময় সন্ধ্যা । কিছুক্ষণ হলো রামিম বাসায় ফিরেছে । পড়ার টেবিলে ঝিম মেরে বসে আছে । তার কাছে সব কিছু অপরিচিত মনে হয় । মনে হয় শুধু সে স্থির আর সব কিছু তাকে পাশ কাটিয়ে ছুটে যাচ্ছে । অবিরাম সে ছুটে চলা । যেন গন্তব্যে পৌঁছানোর ক্লান্তিহীন তাড়া সবার , সবকিছুর । টেবিলে পাশেই পানির বোতল রাখা । পুরা এক বোতল পানি খাওয়ার পরও তার মনে হয় আরো পানি দরকার । আহারে নিদাঘ তিয়াসা ! ঘাড় থেকে শুরু , এর পর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে যন্ত্রনা । তার আর বুঝতে বাকি নেই , আবার ধেয়ে আসছে বিরামহীন যন্ত্রনার সেই পরিচিত রাত । সে রাতেই গাঁ কেঁপে জ্বর আসে রামিমের ।
একদিন , দুইদিন , এভাবে অনেকদিন ; রামিমের প্রতি রাতে গাঁ কেঁপে জ্বর আসে । সে বছর তার আর ফাইনাল পরীক্ষা দেয়া হয় না । চিকিত্সার জন্য রামিম কে ঢাকায় তার মামার বাসায় নিয়ে রাখা হয় । অনেক পরীক্ষা- নিরিক্ষার পর ডাক্তার জানায় তার যে জ্বর আসা যাওয়া সেটা নিতান্তই সিজনাল । রামিম আস্তে আস্তে সুস্থ্য হয়ে উঠে । তবে মাঝে মাঝে তার জ্বর এখনো হয় । অপবিত্র শরীরে অল্প কিছুক্ষন থাকলেই শুধু তখন । পবিত্র-অপবিত্র কিংবা শুদ্ধ-অশুদ্ধতার সাথে জ্বর আসার এই বিষয়টা তার কাছে বেশ হাস্যকর মনে হয় । তারপরও প্রকৃতি যে রহস্যের খেলা খেলছে তা তার কাছে অপরিস্কার আর ঘোলাটে থেকে যায় । কৌতুহল বসত মাঝে মাঝে দু একজন বান্ধবীর সাথে " এ জার্নি বাই রিক্সায় " গিয়েছে । ফলাফল আগেরটাই ।
দীর্ঘদিন হয় রামিম জয়ন্তীর দেখা হয় না । অনেকবার ট্রাই করেও রামিমের কোন খোঁজ পায়নি জয়ন্তী । রামিম তখন আর মোবাইল ইউজ করে না । এইচ,এস,সি পরীক্ষার পর সবাই ইউনিভার্সিটি কোচিং করতে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে । রামিম ঢাকায় থেকে এই্চ,এস,সি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয় । ঢাকা সিটি কলেজে রেজিস্ট্রেশন ট্রান্সফার করে নেয় ।
গ্রীষ্মের কোন এক বিজন দুপুরে রামিমের লেখা চিঠি পড়ে নিশ্বব্দে কেঁদে ঊঠে জয়ন্তী ।
জয়ন্তী ,
কেমন আছো ?
আমাদের ভালবাসা নিয়ে তোমার লুকুচুরির মত আমার গায়ে জ্বর আসা যাওয়া এখন কিছুটা কমেছে । তোমার কি খবর ? এখনো রাগ করে আছো ? কি বলা যায় তোমাকে ! ভাবছি , কি বললে তুমি আমাকে এতটুকু ক্ষমা করতে পারবে ।
দেখলে , প্রকৃতি কি নিষ্ঠুর মজাটাই না নিল ! আমাদের প্রেম নিয়ে তারা কত রকমের রহস্যই না করেছে । প্রথমে ধর্ম , এরপরে পবিত্র-অপবিত্রতার হাস্যকর প্রতিবন্ধকতা । জয়া , কিন্তু এসব সবই সত্যি । আমরা তো কখনোই চাইনি যেমন তেমন ভাবে ভালবেসে কাটিয়ে দিতে আমাদের আজ , কাল । তাহলে এই বিষয়গুলো বারবার ফিরে ফিরে আসবে আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত । একবার না বুঝে কবিতায় লিখেছিলাম , '' প্রতি রাতে আমার গা কেঁপে জ্বর আসে , সে-তো তোমার কারনে ।" । আজ সত্যি বলেই মেনে নিতে হচ্ছে । পারলে আমাকে ক্ষমা করো । আমিই নিজেও বিষয়টা নিয়ে খুব একটা স্বস্থিতে নেই । আমার এখন নির্মলেন্দু গুনের মতই লিখতে ইচ্ছে করে ,
" এখন আমার হৃদয়ে আর প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই,
বাসনার আলোড়ন নেই, আজ আমারও হৃদয়ে শুধু ঘাস,
শুধু স্মৃতি, শুধু স্মৃতি, শুধু স্মৃতি আর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস। "
যদি কখনো তোমার সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই , তবে তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াবো । পুরানো প্রেমের দাবি নিয়ে নয় । আমি একদিন তোমার পাঁজরে যে প্রেম জাগিয়েছিলাম তার পরিচার্যা করতে পারিনি , তার জন্য ক্ষমা চাইতে ।
" জ্বর কুমার "
_____________________________________________________________________
রামিম- জয়ন্তীর প্রেম কাহিনী এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত ।
কিন্তু প্রকৃতির বোধয় আরো কিছু রহস্য বাকি ছিল । অথবা ...
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রামিম । পেছন থেকে কে যেন ডেকে উঠে । তার মনে হয় বহুকাল আগে শুনা কোন এক ডাহুকের ডাক ।
" এখনো কি প্রতিরাতে গা কেঁপে জ্বর আসে তোমার ?" ...কথাটা বলতে গিয়ে ঝাপসা হয়ে আসে জয়ন্তীর চোখ ।
রামিম জয়ন্তীর কিছুটা কাছে এসে অপার মমতায় জানতে চায় ...
" তোমার চোখ এতো লাল কেন ? (আমি যখন আসব তখন কি তোমার চোখ ও লাল থাকবে?)
(collected)